
মোস্তাফিজ আমিন, ভৈরব॥
অবৈধ পথে ইতালি যাত্রার চরম মাশুল গুণতে হচ্ছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের মানিকদী পূর্বকান্দা গ্রামের মিয়াজী বাড়ির যুবক দিপু মিয়াজী (২১) কে। ৯ লাখ টাকায় একই গ্রামের কাজী বাড়ির ফজলুল হক কাজীর হাত ধরে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার চুক্তি হলেও, এখন দিতে হচ্ছে ৭০ লাখ। বর্তমানে দিপু মিয়াজী লিবিয়াতে একটি মাফিয়াচক্রের গোপন আস্তানায় বন্দি হয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তার মুখ-হাত বেধে গোপনকক্ষে নির্যাতনের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে।
পারিবারিক সূত্রে জানাযায়, লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দিপু মিয়াজীর (২১) পরিবারের কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা নেন দালাল ফজলুল হক। ইতিমধ্যে দুই বছর প্রায় পেরিয়ে গেলেও দিপুর ইতালি যাওয়া হয়নি। সময় কাটছে লিবিয়ায় দালাল ও মাফিয়া চক্রের আস্তানায়। কয়েক দিন পরপর মুখে কাপড় বেঁধে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। আর সেই নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো হয় পরিবারকে। তাদের চাহিদা মাফিক টাকা দিলেই থামে নির্যাতন।
ইতালি পৌঁছে দেওয়া ও নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় দালাল চক্র পরিবারের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নতুন করে ২৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৪ জুলাই মুখে কাপড় বেঁধে দিপুর ওপর চালানো নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়।
গতকাল শনিবার দিপুদের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় চারদিকে শুনশান নিরবতা। হাক-ডাক দিতেই পুরনো টিনের দোচালা টিনের ঘর থেকে বের হয়ে আসেন এক যুবক। তার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তায় যেনো নুয়ে আছেন। প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে দিপুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দিপু মিয়াজীর বড় ভাই অপু মিয়াজী বলে পরিচয় দেন।
তিনি জানান, সাত ভাইবোনের মধ্যে দিপু ৬ নম্বর। একই গ্রামের কাজী বাড়ির মফিজ কাজীর ছেলে ফজলুল হক সাত/আট বছর ধরে সাগর পথে ইতালি লোক পাঠানোর কাজ করে আসছেন। বাড়ির পাশের বলে দিপু দালাল ফজলুল হকের মাধ্যমে বিদেশ যেতে আগ্রহী হন। শেষে লিবিয়া হয়ে ইতালি যেতে তাঁর মাধ্যমে সাড়ে ৯ লাখ টাকায় চুক্তিবদ্ধ হন।
২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর লিবিয়া পৌঁছান দিপু। কয়েক দিন পর জানতে পারেন, দিপু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। পরে মাফিয়া চক্রের হাতে চলে যান। দেড় মাস পর ফোন আসে পরিবারের কাছে। নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে এক দিনের মধ্যে ১১ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
চাহিদার সব টাকা দিয়ে মুক্ত হওয়ার পর দিপু চলে যান দালাল ফজলুল হকের নিয়ন্ত্রণে। দালালের অধীন থাকেন চার মাস। ইতালি পৌঁছে দিতে এবার দালাল ১০ লাখ দাবি করে বসেন। দেওয়া হয় টাকা। নৌকায়ও ওঠানো হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর বিপদ বুঝতে পেরে ফিরিয়ে আনা হয়। এভাবে কেটে যায় আরও চার মাস।
দ্বিতীয়বার পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নতুন করে ৯ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা পাওয়ার পর দালাল দ্বিতীয়বার সাগরপথে পৌঁছে দিতে বোটে ওঠান। আলবেনিয়ার কাছে যাওয়ার পর আবার এক চক্রের হাতে আটক হন দিপু। পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পাওয়ার পর দিপুকে দালাল ফজলুল হক নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
চলতি বছরের ১৫ জুলাই দালাল ফজলুল হক সাড়ে আট লাখ টাকা চান। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা দিতে রাজি হননি। এর এক দিন পর ১৬ জুলাই বাসা থেকে একটি চক্র এসে দিপুকে ধরে নিয়ে যায়। ২৪ জুলাই থেকে নির্যাতনের ভিডিও দেখানো শুরু হয়। ভিডিও চালু রেখে মারা হয়। নির্যাতন বন্ধ ও ছাড়া পেতে এবার দাবি করা হয় ২৫ লাখ।
সর্বশেষ কি পরিস্থিতি ? প্রশ্নের জবাবে অপু মিয়াজী বলেন, “গত বৃহস্পতিবার পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছি। আরও বিশ লাখ দিন/চার দিনের মধ্যে যেভাবেই হোক যোগাড় করে পাঠাবো। সহায়-সম্পদ আগেই শেষ হয়েছে। এখন এই ভিটেটুকু ছাড়া অবশিষ্ট নেই। নি:স্ব হয়ে পথে নামলেও, ভাইকে তো রক্ষা করতে হবে।”
এ সময় তিনি কাতর কণ্ঠে বলেন “ভাই একটি অনুরোধ আপনাদের কাছে, আমার ভাইকে নিয়ে আর নিউজ করবেন না। এতে আমার ভাইয়ের ক্ষতি হবে। আগে মাফিয়া চক্রের হাত থেকে রক্ষা পাক, পরে নিউজ কইরেন।”
দিপুদের বাড়ির তিন/চারশ গজ দূরেই দালাল ফজলুল হকের দোতলা বাড়ি। বাড়ি ঘিরে সুউচ্চ প্রতিরক্ষা দেওয়াল। রাস্তা লাগুয়া এসএস পাইপের চক্চকে গেট ভেতর থেকে বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পরও কারও সাড়া পাওয়া যায়নি।
অল্প কিছুক্ষণ পর ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী এক লোক সেই বাড়ির একটু উত্তর দিক থেকে হেঁটে এসে দাঁড়ান। ফজলুল হক ও দিপুর বিষয়ে বললে তিনি নিজের পরিচয় না দিয়ে বলেন-“ফজলুল হক লিবিয়ায় থাকেন। এ পর্যন্ত বহু যুবককে তিনি ইতালি পাঠিয়েছেন। স্সেব পরিবারে সচ্ছলতা ফিরেছে। স্পন্সরের মাধ্যমে ইতালি যেতে হলে ২৫/৩০ টাকা লাগে।
কিন্তু আমাদের দেশের বেশীর ভাগ মানুষের সেই পরিমাণ টাকা নেই। অল্প টাকায় সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যেতে তারা নিজেরাই দালাল খোঁজে বের করেন। তখন পৌঁছতে পারলে দালালের গুণকীর্তন হয় না। ১/২টা ব্যতিক্রম হলেই দালাল মন্দ।”
এ সময় তিনি তার এই অভিমতও যেনো নিউজে উল্লেখ করা হয়, এই অনুরোধ করেন।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শবনম শারমিনের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, অবৈধ পথে নয়-জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর মাধ্যমে যথাযথ প্রশিক্ষণের পর দক্ষ হয়ে বিদেশ গমণের জন্য সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রচারনা ও প্রশিক্ষণসহ নানা সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছে। এ
ক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তাসহ সব কিছুতেই সরকারের নজরদারি থাকে। কিন্তু অবৈধভাবে গেলে কিছুই করার থাকে না। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদনের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান (মোস্তাফিজ আমিন)
সাপ্তাহিক নিরপেক্ষ অরুণিমা, রেজি নং ডি/এ ১৯৬৭
নরসিংদী অফিস :মাতৃছায়া, মরজাল বাস স্ট্যান্ড, নরসিংদী। মোবাইল 0 1711-614044
Copyright © 2026 অরুনিমা. All rights reserved.