নিজস্ব প্রতিবেদক
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর সদরে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন নদীর পাড়ে ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অযত্নে অবহেলায় ময়লায় চাপা কটিয়াদীর বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যে মাটিতে একসময় মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতা আর শহীদের রক্ত মিশে ছিল। সেই বধ্যভূমি আজ নিজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। এমনকি (২৫ মার্চ) বুধবার গণহত্যা দিবসেও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর এই বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি ধুলা-ময়লায় চাপা পড়ে আছে।
সংরক্ষণের অভাব, অযত্নে বধ্যভূমিটি ধীরে ধীরে তার ইতিহাস মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে৷ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদরদের মাধ্যমে সংঘটিত গণহত্যার ইতিহাস এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে হামলা, হত্যাযজ্ঞসহ হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়া এই স্থানগুলো শনাক্ত করা হলেও তার বেশিরভাগই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। যেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেগুলোও রয়েছে অরক্ষিত অবস্থায়। এর মধ্যে পৌর এলাকা কটিয়াদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে একটি।
গচিহাটা রেলসেতু সংলগ্ন, বনগ্রাম নন্দিপুর বধ্যভূমি গুলো ময়লায় কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ইতিহাসের বই ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কটিয়াদী পৌরসভার আড়িয়াল খাঁ নদের তীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন বধ্যভূমি ইতিহাসের এক নির্মমতার সাক্ষী হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরদের সহযোগিতায় স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে কটিয়াদী পাইলট বালিকা বিদ্যালয় সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তৎকালীন কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম মাহবুবা হাসনাত ২০০০ সালে এই বধ্যভূমিটি চিহ্নিত করেন।
প্রতিবছর বিজয় দিবসে এখানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারিভাবে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এখানে অনেকেই গণহত্যার শিকার হলেও ৭ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভে। এর মধ্যে পৌর এলাকার বাগরাইট মহল্লার আছির উদ্দিন, আবদুল মতালিব, আ. খালেক, আফাজ উদ্দিন, বেথইর গ্রামের লাল মিয়া, আচমিতা চাড়িপাড়া এলাকার লাল মিয়া।
বাদ পড়া গণহত্যার শিকার হওয়া শহীদরা হলেন, বিদ্যাসুন্দর দাস ও তার ছেলে সঞ্জিত দাস, সুরেশ চন্দ্র নাথ, অশ্বিনী মিস্ত্রী, মিহির লাল রায়, ক্ষেত্রমোহন ঘোষ ও বিনোদ রায়। এ ছাড়া ঐতিহাসিক গচিহাটা ধুলদিয়া রেল সেতু এলাকায় স্বাধীনতাকামীদের নির্মমভাবে গণহত্যা করে পাক আর্মিরা।
সরেজমিন দেখা যায়, কটিয়াদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন নদীর পাড়ে বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভটি ধুলোমাখা রয়েছে। চারদিকে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে। গচিহাটা রেল সেতু সংলগ্ন স্মৃতিস্তম্ভটিও অযত্নে রয়েছে। ঘিরে রয়েছে লতাপাতা। বনগ্রাম নন্দিপুর এলাকায় বধ্যভূমিও অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। এই স্থানগুলোর ইতিহাস কি, তা জানে না স্থানীয় লোকজন। অনেকেই ছবি তোলার পর বুঝতে পারেন এটি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু হয়তো। এভাবেই ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষী ও ঘটনা মুছে যাচ্ছে।
কটিয়াদী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের আহ্বায়ক ইসরাঈল মিয়া বলেন, এটি আক্ষেপের বিষয়। ইতিহাসের নির্মমতার সাক্ষী এই বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। গণহত্যা দিবসেও এই ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ ধুলোমাখা দেখলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কষ্ট পাই। ভবিষ্যতে এগুলোর বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের অবগত করব।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, কোনো অবস্থাতেই শহীদদের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভগুলো অবহেলার সুযোগ নেই৷ আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।
https://slotbet.online/