মোস্তাফিজ আমিন, ভৈরব॥
মার্শাল আর্টের নানা কসরৎ রপ্ত করছে এক ঝাঁক শিশু-কিশোর, ছেলে-মেয়ে। যেনো ক্লান্তি নেই। মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই তারা কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হবে। কখনও দলীয়, কখনওবা দ্বৈতভাবে একে অন্যকে লাথি-কিল-ঘুষি মারছে। আক্রান্ত আক্রমণকারীকে প্রতিহত করছে সাধ্যমতো।
আবার কখনও পাঞ্চিং ডলে ইচ্ছেমতো বক্সিং, সজোরে লাথি মারছে দলগতভাবে সারি বেঁধে, একে একে। আর এইসব গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছেন ওস্তাদজী। ভুল হলে শুধরে দিচ্ছেন, গভীর মমতায়। কখনওবা শাসনে।
এইভাবেই চলছে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের “রমজান মার্শাল আর্ট একাডেমীর” মার্শাল আর্ট বা কারাতে প্রশিক্ষণ। শহরের কমলপুর এলাকার একাডেমীর প্রশিক্ষণকক্ষে চলছে অর্ধশত ক্ষুদে কারাতেদের এই প্রশিক্ষণ।
সপ্তাহের প্রতি বুধবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে চলে তাদের ইনডোর চর্চা। আর শুক্র ও শনিবার সকালে চলে স্থানীয় একটি হাইস্কুলের মাঠে আউটডোর চর্চা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারাতে হলো জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে উদ্ভূত একটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় মার্শাল আর্ট বা আত্মরক্ষার কৌশল। যার আক্ষরিক অর্থ “খালি হাত”। এতে কোনো অস্ত্র ব্যবহার না করে হাত, পা, কনুই এবং হাঁটুর ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আঘাত প্রতিহত পাল্টা আক্রমণ করা হয়। এটি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিার পাশাপাশি মানসিক শৃংঙখলা ও আত্মবিশ্বাসের চর্চাও শেশায়।
প্রশিক্ষণার্থী ক্ষুদে এইসব কারাতেরা জানায়, কারাতে শিখে তারা শারীরিকভাবে যেমন নিজেদেরকে ফিট মনে করে, তেমনি যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে আক্রমণকারিকে মোকাবেলা করে নিজেকে রক্ষা করার আত্মপ্রত্যয়ও তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চালিক ও জাতীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা জয়ে করে আনছে স্বর্ণ, রোপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক। যা তাদেরকে বেশ উজ্জীবিত করছে।
তাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে ব্ল্যাকবেল্ট অর্জন করেছে। যা খুবই গৌরবের। এখন তাদের লক্ষ্য দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক আসরে খেলে বিজয়ী হয়ে ভৈরব তথা সমগ্র দেশের জন্য সুনাম অর্জন করা। তারা সকল ছেলে-মেয়েকে আত্মরক্ষা, শরীর গঠন, আত্মপ্রত্যয় তৈরি এবং সম্মান অর্জনে কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়।
এদিকে অভিভাবকরা জানান, বর্তমান সময়ে ভৈরবসহ সারাদেশে মানুষের নিরাপত্তা কমে গেছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের। পথে-ঘাটে অহরহ ছিনতাইসহ শারীরিক লাঞ্ছনা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এইসব অনাকাংখিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে কারাতে একটি বড় নিয়ামক বা মাধ্যম। একজন কারাতে প্রশিক্ষণ পাওয়া ব্যক্তি আর সাধারণের মাঝে অনেক পার্থক্য। একজন কারাতে জানা ব্যক্তি জানেন কিভাবে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
এ ছাড়া শারীরিকভাবে সুস্থ্য থাকা, মোবাইলে গেইম, ফেসবুক, টিকটকসহ নানান কুঅভ্যাস থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষায় এই কারাতে প্রশিক্ষণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে গৌরবান্বিত করে একজন কারাতেকে।
ভৈরব পৌর শহরের পলতাকান্দা এলাকার সন্তান কারাতে ওস্তাদ মোহাম্মদ রমজান। তিনি দেশের হয়ে ৪ বার সাফ গেইমসে অংশ নিয়ে স্বর্ণপদক জয় করে এনেছেন। তিনি বাংলাদেশ আনসার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারাতে প্রশিক্ষক। তিনি তার এলাকা প্রীতি থেকে ২০২৩ সালে এখানে গড়ে তুলেন “রমজান মার্শাল আর্ট একাডেমী”। তিনিই এই একাডেমীর একমাত্র ও প্রধান প্রশিক্ষক। প্রায় অর্ধশত শিশু-কিশোর ছেলে-মেয়েকে তিনি কারাতে হিসেবে গড়ে তুলছেন।
তিনি জানান, কারাতে প্রশিক্ষণ ছেলে-মেয়েদের শারীরিক মানসিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষায় কাজ করে। জীবনকে সুশৃংখল করে। মন্দ কাজ ও অভ্যাস থেকে রক্ষা করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ মেলে। এ ছাড়া বাংলাদেশের যেকোনো বেসামরিক আধারসামরিক ও সামরিক বাহিনীতে চাকুরির ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যায়।
তার শিক্ণার্থীরা ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদকসহ অনেক সনদপত্র অর্জন করেছে। একজন শিক্ষার্থী বিকেএসপিতে সুযোগ পেয়েছে। তিনি আশাবাদী, এরা একদিন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলের গৌরব বয়ে আনবে।
https://slotbet.online/